আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের গৌরব, চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্গত পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার জেলার ইতিহাস। বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকতের জন্য বিখ্যাত এই জনপদের রয়েছে হাজার বছরের পুরনো এক বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস।

কক্সবাজার জেলার ইতিহাস
প্রাচীন ও মধ্যযুগ: আরাকানী ও পর্তুগিজ প্রভাব
কক্সবাজারের প্রাচীন ইতিহাস মূলত বহিঃশক্তির আগমন ও প্রভাবের ইতিহাস। এর ভৌগোলিক অবস্থান একে প্রাচীনকাল থেকেই গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল।
- প্রাথমিক যোগাযোগ: অষ্টম শতকের দিকে আরব বণিক ও ধর্ম প্রচারকগণ চট্টগ্রাম ও আকিব (বর্তমান মিয়ানমারের সিত্তওয়ে) বন্দরে যাতায়াতের পথে এই উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবহার করতেন। ফলে আরব সংস্কৃতির সাথে এই অঞ্চলের মানুষের প্রথম পরিচয় ঘটে।
- হরিকেল ও আরাকান শাসন: নবম শতাব্দীতে বৃহত্তর চট্টগ্রাম এবং আজকের কক্সবাজার অঞ্চল প্রাচীন বঙ্গীয় রাজ্য ‘হরিকেল’-এর রাজা কান্তিদেব দ্বারা শাসিত হতো। তবে এই অঞ্চলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ছিল প্রতিবেশী আরাকান রাজ্যের। ৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে আরাকান রাজা ‘সুলাত ইঙ্গ চন্দ্র’ চট্টগ্রাম দখল করার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে কক্সবাজার আরাকান রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
- পর্তুগিজ জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য: মধ্যযুগে, বিশেষ করে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে এই অঞ্চলটি আরাকানী (মগ) এবং পর্তুগিজ জলদস্যুদের (হার্মাদ) অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। তারা এই উপকূল ব্যবহার করে দাস ব্যবসা ও লুটতরাজ চালাত, যা মুঘলদের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ ছিল।
মুঘল বিজয় ও স্থিতিশীলতা
১৬৬৬ সাল কক্সবাজারের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। বাংলার মুঘল সুবাদার শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম বিজয়ের জন্য এক বিশাল অভিযান প্রেরণ করেন। তার পুত্র ও সেনাপতি বুজুর্গ ওমেদ খান কর্ণফুলি নদীর মোহনায় আরাকানী ও পর্তুগিজদের পরাজিত করে চট্টগ্রাম দখল করেন।
চট্টগ্রাম বিজয়ের ধারাবাহিকতায় মুঘল বাহিনী আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়। তারা কর্ণফুলির দক্ষিণের মাঘ কেল্লা এবং পরবর্তীতে আরাকানীদের শক্তিশালী ঘাঁটি ‘রামু কেল্লা’ অতর্কিত আক্রমণে দখল করে নেয়। এর মাধ্যমে এই অঞ্চলে মুঘল শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং দীর্ঘদিনের জলদস্যুতার অবসান ঘটে।
ব্রিটিশ আমল: শরণার্থী সংকট ও ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের আবির্ভাব
পলাশীর যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বাংলার ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখনো এই প্রান্তিক অঞ্চলে তাদের পূর্ণ কর্তৃত্ব ছিল না। কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোম্পানি চাষীদের মাঝে জমি বিতরণের এক উদারনীতি গ্রহণ করে, ফলে চট্টগ্রাম ও আরাকান থেকে মানুষ এই উর্বর এলাকায় বসতি স্থাপন শুরু করে।
- আরাকান সংকট (১৭৮৪): কক্সবাজারের আধুনিক ইতিহাসের সূচনা হয় এক মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে। ১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা বোধাপায়া আরাকান রাজ্য দখল করে চরম হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন শুরু করেন।
- শরণার্থী ঢল (১৭৯৯): বর্মী রাজার হাত থেকে বাঁচতে হাজার হাজার আরাকানী (রাখাইন) নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে নাফ নদী পার হয়ে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত এই অঞ্চলে আশ্রয় নেয়। ঐতিহাসিক তথ্যমতে, ১৭৯৯ সালের দিকে প্রায় ৩০ হাজার (মতান্তরে আরও বেশি) আরাকানী উদ্বাস্তু এখানে পালিয়ে আসে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের বাসস্থান ও খাদ্যের সংস্থান করা কোম্পানির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
মানবতার সেবক ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স
এই ভয়াবহ শরণার্থী সংকট মোকাবিলার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একজন দক্ষ ও মানবিক সেনা কর্মকর্তা, ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সকে (Captain Hiram Cox) সুপারিনটেনডেন্ট বা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ দেয়।
- পুনর্বাসন প্রক্রিয়া: ক্যাপ্টেন কক্স শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নেন। তার তত্ত্বাবধানে প্রতি শরণার্থী পরিবারকে চাষাবাদের জন্য ২.৪ একর জমি এবং বেঁচে থাকার জন্য ছয় মাসের খাদ্যসামগ্রী প্রদান করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তিনি কেবল ত্রাণই দেননি, স্থানীয় জমিদার ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের হাত থেকে অসহায় শরণার্থীদের রক্ষা করতেও লড়াই করেছেন।
- বাজার স্থাপন ও মৃত্যু: শরণার্থীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে ক্যাপ্টেন কক্স রাখাইন অধ্যুষিত এলাকায় একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। দুঃখজনকভাবে, প্রতিকূল আবহাওয়া ও অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পূর্বেই ১৭৯৯ সালে (মতান্তরে ১৮০২ সালে) এই মহানুভব ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেন।
নামকরণের ইতিহাস: পালংকী থেকে কক্সবাজার
কক্সবাজারের নাম সবসময় এমন ছিল না। এর নামকরণের পেছনে রয়েছে একটি বিবর্তন।
- প্রাচীন নাম: কক্সবাজারের প্রাচীন নাম ছিল ‘পালংকী’।
- প্যানোয়া: একসময় এটি ‘প্যানোয়া’ নামেও পরিচিত ছিল। স্থানীয় ভাষায় ‘প্যানোয়া’ শব্দটির অর্থ ‘হলুদ ফুল’। অতীতে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন এলাকাগুলো এক ধরণের হলুদ ফুলে স্বর্ণালি আভায় ঝকমক করত বলে এই নাম হয়েছিল।
- কক্সবাজার: ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স কর্তৃক স্থাপিত বাজারটি স্থানীয়দের মাঝে তার সততা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘কক্স সাহেবের বাজার’ নামে পরিচিতি লাভ করে। কালক্রমে এই ‘কক্স সাহেবের বাজার’ সংকুচিত হয়ে আজকের ‘কক্সবাজার’ নাম ধারণ করে এবং পুরো জেলার নামেই পরিণত হয়।
প্রশাসনিক বিবর্তন: মহকুমা থেকে জেলা
ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে বর্তমান বাংলাদেশ পর্যন্ত কক্সবাজারের প্রশাসনিক কাঠামো ধাপে ধাপে উন্নত হয়েছে।
- ১৮৫৪: কক্সবাজার থানা গঠিত হয়। একই বছর কক্সবাজার, চকরিয়া, মহেশখালী ও টেকনাফ থানার সমন্বয়ে ‘কক্সবাজার মহকুমা’ গঠিত হয়, যা চট্টগ্রাম জেলার অধীনে ছিল।
- পরবর্তী বিস্তৃতি: প্রশাসনিক সুবিধার্থে পরবর্তীতে টেকনাফ থেকে উখিয়া, মহেশখালী থেকে কুতুবদিয়া এবং কক্সবাজার সদর থেকে রামু থানাকে পৃথক করে এই মহকুমার অধীনে তিনটি নতুন থানা গঠন করা হয়।
- ১৯৫৯: কক্সবাজারকে ‘টাউন কমিটি’তে রূপান্তর করা হয়।
- ১৯৭২: স্বাধীন বাংলাদেশে টাউন কমিটি বিলুপ্ত করে একে ‘পৌরসভা’য় উন্নীত করা হয়।
- ১৯৮৪ (ঐতিহাসিক দিন): প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচির আওতায় এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ কক্সবাজার মহকুমাকে পূর্ণাঙ্গ জেলায় উন্নীত করা হয়।
- সর্বশেষ উপজেলা: ২০০২ সালের ২৩ এপ্রিল প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে বৃহত্তর চকরিয়া উপজেলা থেকে পেকুয়া উপজেলাকে পৃথক করা হয়। বর্তমানে কক্সবাজার জেলায় মোট ৮টি উপজেলা ও ৯টি থানা রয়েছে।
১ thought on “কক্সবাজার জেলার ইতিহাস”