খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই মে ২০২৩, ১:৩৭ এএম
উখিয়া উপজেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ, যা চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক এলাকাই নয়, বরং বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের একাংশ, পাহাড়-অরণ্য এবং সাম্প্রতিক সময়ের বৈশ্বিক মানবিক সংকটের সাক্ষী। ২১°০৮´ থেকে ২১°২১´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২°০৩´ থেকে ৯২°১২´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত এই উপজেলার আয়তন ২৬১.৮ বর্গ কিলোমিটার। এর উত্তরে রামু, দক্ষিণে টেকনাফ, পূর্বে নাইক্ষ্যংছড়ি ও মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য এবং পশ্চিমে বিশাল বঙ্গোপসাগর অবস্থিত।
প্রশাসন ও ইতিহাস: উখিয়া থানা গঠিত হয়েছিল ১৯২৬ সালে এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে ১৯৮৩ সালে এটিকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়। বর্তমানে এই উপজেলায় ৫টি ইউনিয়ন রয়েছে: রাজাপালং, রত্নাপালং, হলদিয়াপালং, জালিয়াপালং এবং পালংখালী।
ভূ-প্রকৃতি ও জলাশয়: উখিয়ার ভূ-প্রকৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। একদিকে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ, অন্যদিকে পাহাড় ও টিলাবেষ্টিত অরণ্য। এই উপজেলার পূর্ব সীমান্ত ঘেঁষে প্রবাহিত ঐতিহাসিক নাফ নদী বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে বিভক্ত করেছে। এছাড়া রেজু খালসহ ছোট-বড় অসংখ্য ছড়া ও খাল এই জনপদের প্রাণ।
জনসংখ্যা ও জনবৈচিত্র্য: ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা ১,৫৫,১৮৭ জন হলেও, বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই উপজেলায় হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষেরা দীর্ঘকাল ধরে সম্প্রীতির সাথে বসবাস করে আসছে। এই অঞ্চলে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাসহ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে, যা এর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট: রোহিঙ্গা সংকট ও মানবিকতা: উখিয়া বর্তমানে বিশ্বজুড়ে পরিচিত এক মানবিক কারণে। ২০১৭ সাল থেকে মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এই উপজেলায় আশ্রয় নিয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরগুলো, যেমন—কুতুপালং ও বালুখালী মেগাক্যাম্প, এই উপজেলার রাজাপালং ও পালংখালী ইউনিয়নে অবস্থিত। স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাদের সীমিত সামর্থ্য নিয়েও এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দিয়ে মানবিকতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। যদিও এর ফলে স্থানীয় পরিবেশ, অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে দেশি-বিদেশি এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মীদের এক বৃহৎ কর্মক্ষেত্র এই উখিয়া।
পর্যটন ও দর্শনীয় স্থান: উখিয়া উপজেলার পর্যটন সম্ভাবনা অপরিসীম:
ইনানী সমুদ্র সৈকত: প্রবাল পাথরের জন্য বিখ্যাত এই সৈকতটি কক্সবাজারের মূল শহর থেকে মেরিন ড্রাইভ ধরে দক্ষিণে অবস্থিত। এর স্বচ্ছ নীল জল এবং শান্ত পরিবেশ পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
পাটুয়ারটেক সৈকত: পাথুরে সৈকতের এক অপূর্ব সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান।
মেরিন ড্রাইভ সড়ক: বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ এই সমুদ্রতटीय সড়কটি উখিয়া উপজেলার ওপর দিয়েই বয়ে গেছে, যা নিজেই এক পর্যটন আকর্ষণ।
জাদিমুরা বৌদ্ধ বিহার: প্রাচীন এই বিহারটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের এক গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান।
অর্থনীতি ও জীবিকা: উখিয়ার অর্থনীতি মূলত কৃষি ও মৎস্যনির্ভর। এখানকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি (৫৪.৪০%)। প্রধান ফসলের মধ্যে ধান, পান, সুপারি ও শাকসবজি উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে উখিয়ার পানের খ্যাতি দেশজুড়ে। সমুদ্র উপকূলবর্তী হওয়ায় মৎস্য শিকার এবং চিংড়ি পোনা আহরণ ও রপ্তানি অর্থনীতির একটি বড় অংশ। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে এনজিও কার্যক্রম এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশের সাথে সাথে পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং বিভিন্ন সেবামূলক খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কুটির শিল্পের মধ্যে বাঁশ ও বেতের কাজ, তাঁতশিল্প এবং সূচিশিল্প উল্লেখযোগ্য।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি: শিক্ষার হার (২০০১ সালের হিসাবে গড় ২৮.৪%) তুলনামূলক কম হলেও বর্তমানে তা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চলছে। উখিয়া ডিগ্রি কলেজ, রত্না পালং বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় এবং উখিয়া মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশ কিছু পুরনো ও নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। এখানে মসজিদ, মন্দির ও প্যাগোডাগুলো ধর্মীয় সম্প্রীতির সাক্ষ্য বহন করে। স্থানীয় সংস্কৃতিতে বৈশাখী মেলা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের আমেজ দেখা যায়।
যোগাযোগ ব্যবস্থা: কক্সবাজার শহর থেকে মেরিন ড্রাইভ এবং কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক—উভয় পথেই উখিয়ায় যাতায়াত করা যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটলেও এখনো অনেক কাঁচারাস্তা রয়েছে।
উখিয়া উপজেলা কেবল একটি প্রশাসনিক মানচিত্রের অংশ নয়, এটি আজ বিশ্ব রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ মানবিক কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনা, অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিশাল চ্যালেঞ্জ—এই দুইয়ের মাঝেই এগিয়ে চলেছে উখিয়ার জনজীবন।
মন্তব্য